মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: জঙ্গলমহল ও পশ্চিমাঞ্চলের উন্নয়নে এবার জোরকদমে কাজ শুরু করতে চলেছে রাজ্য সরকার। বাঁকুড়ায় পশ্চিমাঞ্চল উন্নয়ন পর্ষদের কাজের পর্যালোচনা বৈঠক শেষে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী (Suvendu Adhikari) জানালেন, চলতি অর্থবর্ষের বাকি আট মাসে পশ্চিমাঞ্চলের উন্নয়নের জন্য মোট ১,৬১০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। এর মধ্যে ১,৬০০ কোটি টাকা সরাসরি উন্নয়নমূলক প্রকল্পে খরচ করা হবে। দীর্ঘদিন পিছিয়ে থাকা জঙ্গলমহল ও পশ্চিমাঞ্চলে উন্নয়নের গতি ফেরাতেই এই বিশেষ উদ্যোগ বলে জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। বাঁকুড়ার বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন বাঁকুড়া, পুরুলিয়া, ঝাড়গ্রাম, পশ্চিম মেদিনীপুর, বীরভূম, পূর্ব বর্ধমান ও পশ্চিম বর্ধমানের সাংসদ-বিধায়ক, মন্ত্রিসভার সদস্য, জেলাশাসক এবং প্রায় ৭৫ জন বিডিও। বৈঠকে রাস্তা, পানীয় জল, স্কুল, আবাসন, বিদ্যুৎ, কর্মসংস্থান-সহ একাধিক বিষয়ে জেলাভিত্তিক অগ্রাধিকারের তালিকা তৈরি করা হয়।
সেপ্টেম্বরেই প্রকল্প চিহ্নিতকরণ, পুজোর পর মাঠে কাজ
জঙ্গলমহল ও পশ্চিমাঞ্চলের উন্নয়নে আগামী তিন মাসকে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার। মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশ অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরে প্রকল্প চিহ্নিত করে ডিপিআর তৈরি, অক্টোবরে টেন্ডার এবং পুজোর পর শুষ্ক মরসুম শুরু হলেই বাস্তব কাজ শুরু হবে। পিছিয়ে থাকা গ্রাম পঞ্চায়েতগুলিকে অগ্রাধিকার দিয়ে প্রতিটি এলাকায় অন্তত ৫০ লক্ষ টাকার উন্নয়নমূলক কাজ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বৈঠকে আগের সরকারের বিরুদ্ধে তীব্র আক্রমণ শানিয়ে শুভেন্দু বলেন, “২০১৯-এর লোকসভা নির্বাচনে এই সব আসনে বিজেপি জেতার পর প্রতিশোধের রাজনীতির কারণে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী পশ্চিমাঞ্চল উন্নয়ন দফতরকে কার্যত অকেজো করে রেখেছিলেন। গত অর্থবর্ষে এই খাতে মাত্র ২০ কোটি টাকা বরাদ্দ ছিল, যার মধ্যে কাজ হয়েছে মাত্র ৬ কোটির! কিন্তু আমাদের সরকার মাত্র চার মাসের ‘ভোট অন অ্যাকাউন্ট’ ও বাকি আট মাসের হিসাবে এই অঞ্চলের জন্য মোট ১,৬১০ কোটি টাকা বরাদ্দ করেছে। এর মধ্যে ১০ কোটি টাকা অফিসার-কর্মীদের বেতনের জন্য এবং বাকি ১,৬০০ কোটি টাকা মূল পরিকল্পনা খাতে খরচ করা হবে।” পরিষেবা মানুষের কাছে আরও দ্রুত পৌঁছে দিতে ঝাড়গ্রামে পিইউপি-র নতুন কার্যালয় এবং বীরভূমের বোলপুর অফিসের পাশাপাশি সিউড়ি জেলা পরিষদে ক্যাম্প অফিস চালুর নির্দেশও দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী।
স্কুল, আইসিডিএস ও পানীয় জলে বিশেষ নজর
জঙ্গলমহলের আবহাওয়া ও পরিকাঠামোগত সমস্যার কথা মাথায় রেখে স্কুল ও শিশু-কেন্দ্রিক পরিকাঠামো উন্নয়নেও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রতিটি স্কুলে ফ্যান, পানীয় জল, ডাইনিং স্পেস-সহ কিচেন এবং ছাত্রছাত্রীদের পৃথক শৌচাগার নিশ্চিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে প্রাথমিক বিদ্যালয় ও আইসিডিএস কেন্দ্রগুলির সংস্কারেও অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।
বিডিওদের ‘অ্যাক্টিভ’ হওয়ার বার্তা
উন্নয়ন প্রকল্পের বাস্তবায়নে মাঠপর্যায়ের প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। নয়াগ্রাম, বান্ধোয়ানের মতো পিছিয়ে থাকা ব্লকের প্রশাসনিক আধিকারিকদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলেন তিনি। শুভেন্দু বলেন, “জেলাশাসকদের পারফরম্যান্সে আমরা সন্তুষ্ট। তবে কিছু কিছু বিডিও-র লেভেলে এখনও জড়তা রয়েছে। সেই জড়তা কাটিয়ে বিডিও-দের আরও অ্যাক্টিভ হতে হবে, কারণ ইমপ্লিমেন্টেশনের দায়িত্ব তাঁদের হাতেই।”
৬ ফ্ল্যাগশিপ প্রকল্পের সুবিধা পৌঁছবে প্রতিটি পরিবারে
পশ্চিমাঞ্চলের প্রকৃত উপভোক্তাদের কাছে সরকারি প্রকল্পের সুবিধা পৌঁছে দিতে ছ’টি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পকে বিশেষ নজরদারির আওতায় আনা হয়েছে।
- ১. অন্নপূর্ণা যোজনা: প্রকৃত উপভোক্তাদের খাদ্যসুরক্ষা নিশ্চিত করা।
- ২. আয়ুষ্মান ভারত: যেখানে এই সুবিধা কার্যকর হবে না, সেখানে ‘মুখ্যমন্ত্রী স্বাস্থ্য বীমা যোজনা’র মাধ্যমে স্বাস্থ্য পরিষেবা নিশ্চিত করা।
- ৩. বিকশিত ভারত যোজনা: ১২,০০০ কোটি টাকার বাজেটে ১২৫ দিনের কাজ এবং পরিবারপিছু বছরে ৩৪,৫০০ টাকার সংস্থানের লক্ষ্যমাত্রা।
- ৪. প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনা: ইতিমধ্যেই ২৫ লক্ষ কাঁচা বাড়ির নাম নথিভুক্ত হয়েছে। আরও যোগ্য পরিবারের তালিকা তৈরির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
- ৫. প্রধানমন্ত্রী সূর্যঘর: কেন্দ্রের ১ লক্ষ পরিবারের লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় রাজ্যে ৫ লক্ষ পরিবারকে সৌর সংযোগ দেওয়ার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
- ৬. জল জীবন মিশন: ‘নল আছে জল নাই’ পরিস্থিতি এবং অনিয়ম বন্ধ করে প্রতিটি বাড়িতে পানীয় জল পৌঁছে দেওয়ার নির্দেশ।
ধর্মান্তর ও মৌলবাদী তৎপরতা নিয়ে কড়া বার্তা
বাঁকুড়া ও জঙ্গলমহল এলাকায় বিদেশি অর্থের সাহায্যে দরিদ্র মানুষকে বিভ্রান্ত করে বেআইনি ধর্মান্তর এবং মৌলবাদী তৎপরতার অভিযোগ নিয়েও কড়া অবস্থান জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, “খুব শিগগিরই আমরা অভিন্ন দেওয়ানি বিধি (UCC) নিয়ে আসছি—‘এক দেশ, এক আইন, এক মুখ্যমন্ত্রী’। এর পরে আমাদের পরবর্তী পদক্ষেপ হবে জোর করে ধর্মান্তর রুখতে কঠোর আইন এবং জমি কেনাবেচার ক্ষেত্রে নতুন আইনি বিধিনিষেধ জারি করা।”
পিএসসি-এসএসসি নিয়োগে স্বচ্ছতার বার্তা
সরকারি নিয়োগ নিয়েও এ দিন মুখ খুলেছেন মুখ্যমন্ত্রী। পিএসসি ও এসএসসিতে নতুন নেতৃত্ব এনে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ফেরানোর দাবি করেন তিনি। শুভেন্দু বলেন, “পিএসসি-র মাথায় অনিল বর্মা কিংবা এসএসসি-র চেয়ারম্যান হিসেবে দুষ্মন্ত নারিয়ালাকে বসিয়ে প্রশাসন স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে যে, দুর্নীতিগ্রস্তদের আর স্থান নেই। নিয়োগকারী সংস্থাগুলোকে পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন দেওয়া হয়েছে।” তাঁর দাবি, সরকারের দায়িত্ব মূলত ক্যাবিনেটে পদের অনুমোদন, চাকরির পদ তৈরি এবং অর্থ দফতরের ছাড়পত্র দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে। নিয়োগের বাকি প্রক্রিয়া স্বশাসিত বোর্ডের মাধ্যমে সম্পন্ন হবে। তাঁর কথায়, “আমাদের সরকার মেধার ভিত্তিতে স্বচ্ছ নিয়োগ নিশ্চিত করবে। সব প্রক্রিয়া শেষে স্বচ্ছতার প্রতীক হিসেবে আমরা নির্বাচিতদের হাতে নিয়োগপত্র তুলে দেব।”
সিএএ, ভোটার তালিকা ও সীমান্ত নিয়ে অবস্থান
বাংলাদেশ থেকে আসা হিন্দু শরণার্থীদের প্রসঙ্গেও এ দিন নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্য, সিএএ-তে আবেদন করা শরণার্থীদের ট্রাইব্যুনালে আবেদন নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত রেশন, অন্নপূর্ণা বা বার্ধক্য ভাতার মতো সরকারি সুবিধা থেকে বঞ্চিত করা যাবে না। এর পাশাপাশি সীমান্ত এলাকার জমি সংক্রান্ত জটিলতা মেটানো, ভুয়া ওবিসি তালিকা বাতিল এবং ইমাম-মোয়াজ্জেম ভাতা বন্ধ করার বিষয়েও প্রশাসনিক পদক্ষেপের কথা জানান তিনি। সব মিলিয়ে, বাঁকুড়ার বৈঠক থেকে জঙ্গলমহল ও পশ্চিমাঞ্চলের উন্নয়নকে নতুন করে গতি দেওয়ার পাশাপাশি প্রশাসনের জবাবদিহি, সরকারি প্রকল্পের বাস্তবায়ন এবং নিয়োগে স্বচ্ছতার উপরও জোর দিল রাজ্য সরকার। এখন ঘোষিত তিন মাসের রোডম্যাপ কত দ্রুত বাস্তবে রূপ নেয়, নজর থাকবে সেই দিকেই।

Leave a Reply