মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: পাকিস্তানের (Pakistan) খাইবার পাখতুনখোয়া প্রদেশের ট্যাঙ্ক জেলায় যৌথ নিরাপত্তা চেকপোস্টে ভয়াবহ জঙ্গি হামলায় (TTP Attack) অন্তত ১৫ জন নিরাপত্তাকর্মী নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে রয়েছেন ১২ জন সেনাকর্মী, দু’জন পুলিশ সদস্য এবং বন দফতরের এক সরকারি আধিকারিক। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর গণমাধ্যম শাখা আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ বিভাগ জানিয়েছে, নিষিদ্ধ ঘোষিত তেহরিক-ই-তালিবান পাকিস্তান এই হামলা চালিয়েছে। হামলার এই ঘটনা ঘটে শুক্রবার ভোরে।
“ফিতনা-আল-খাওয়ারিজ” (Pakistan)
সেনাবাহিনীর তরফে জারি করা বিবৃতিতে বলা হয়েছে, হামলাটি চালিয়েছে “ফিতনা-আল-খাওয়ারিজ” নামে চিহ্নিত জঙ্গিরা। পাকিস্তান সরকার বর্তমানে নিষিদ্ধ তেহরিক-ই-তালিবান পাকিস্তানের সদস্যদের বোঝাতে এই পরিভাষা ব্যবহার করে। এক সময় এই সংগঠনের প্রতি পাকিস্তান সরকারের নরম মনোভাব ছিল বলে দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ উঠেছে। কারণ, সংগঠনটির বহু সদস্য আফগানিস্তানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র-সহ পশ্চিমী দেশগুলির সেনাদের বিরুদ্ধে হামলায় জড়িত ছিল। সেই সময় পাক প্রশাসন তাদের কার্যকলাপের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে অনীহা দেখিয়েছিল বলে বিভিন্ন মহলে সমালোচনাও হয়েছিল। ঘটনার বিবরণ দিতে গিয়ে আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ বিভাগ জানিয়েছে, জঙ্গিরা প্রথমে যৌথ চেকপোস্টের নিরাপত্তা বলয় ভেঙে ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করে। কিন্তু সেখানে মোতায়েন নিরাপত্তাকর্মীরা দ্রুত এবং দৃঢ় প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। তাঁদের সতর্কতা, সাহসিকতা ও পেশাদারিত্বের কারণে জঙ্গিদের সেই চেষ্টা ব্যর্থ হয়। এরপর পাল্টা অভিযানে নিরাপত্তাবাহিনী ১৫ জন জঙ্গিকে হত্যা করে।
ভয়াবহ বিস্ফোরণ
তবে প্রথম আক্রমণে ব্যর্থ হওয়ার পর জঙ্গিরা কৌশল পাল্টায়। বিস্ফোরক বোঝাই একটি গাড়ি নিয়ে তারা চেকপোস্টের সীমানা প্রাচীরে গিয়ে সজোরে ধাক্কা মারে। সঙ্গে সঙ্গে ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটে। বিস্ফোরণের অভিঘাতে চেকপোস্টের পরিকাঠামো ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ওই বিস্ফোরণেই ১২ জন সেনাসদস্য, দু’জন পুলিশ সদস্য এবং বন দফতরের এক সরকারি আধিকারিক নিহত হন। পাক সেনাবাহিনী নিহতদের “শহিদ” আখ্যা দিয়ে জানিয়েছে, তাঁরা দেশের নিরাপত্তা রক্ষায় সর্বোচ্চ আত্মত্যাগ করেছেন। সেনাবাহিনী আরও জানিয়েছে, হামলার পর গোটা এলাকায় তল্লাশি ও সাঁড়াশি অভিযান শুরু হয়েছে। হামলায় জড়িত অন্য কোনও জঙ্গি আশপাশে লুকিয়ে রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। পাকিস্তানের নিরাপত্তাবাহিনী ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাগুলি “আজম-ই-ইস্তেহকাম” কর্মসূচির আওতায় সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান আরও জোরদার করবে বলেও জানানো হয়েছে। জাতীয় কর্মপরিকল্পনা সংক্রান্ত ফেডারেল শীর্ষ কমিটির অনুমোদিত এই কর্মসূচির লক্ষ্য, বিদেশি মদতপুষ্ট সন্ত্রাসবাদ সম্পূর্ণ নির্মূল করা (Pakistan)। সেনাবাহিনীর জারি করা বিবৃতিতে বলা হয়েছে, “আমাদের সাহসী সেনাদের এই আত্মত্যাগ দেশের নিরাপত্তা রক্ষায় আমাদের অটল অঙ্গীকারকে আরও শক্তিশালী করেছে। যে কোনও মূল্যে দেশের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে আমরা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ (TTP Attack)।”
আত্মঘাতী বিস্ফোরণের ঘটনা বেড়েছে
এদিকে, গত সপ্তাহেও খাইবার পাখতুনখোয়ার বান্নু জেলা এবং সংলগ্ন এলাকায় নিরাপত্তাবাহিনী বড়সড় অভিযান চালায়। সেনাবাহিনীর দাবি, গত ২৪ ঘণ্টায় সেখানে সংঘর্ষে তেহরিক-ই-তালিবান পাকিস্তানের ২৪ জন জঙ্গি নিহত হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে বান্নু জেলায় পুলিশকে লক্ষ্য করে হামলা এবং আত্মঘাতী বিস্ফোরণের ঘটনা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে গিয়েছে বলে জানিয়েছে সেনাবাহিনী। বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, এই ধরনের হামলার নেপথ্যে থাকা জঙ্গি এবং তাদের সহায়ক নেটওয়ার্ককে চিহ্নিত করতে যৌথ গোয়েন্দা-তথ্যভিত্তিক ব্যাপক অভিযান শুরু হয়েছে। বান্নু জেলা এবং সংলগ্ন এলাকায় তীব্র গোলাগুলির পর ২৪ জন জঙ্গিকে হত্যা করা হয়েছে বলেও দাবি করেছে সেনাবাহিনী (Pakistan)। চলতি বছরের মে মাসেও বান্নু জেলার ফতেহ খেল পুলিশ পোস্টে আত্মঘাতী হামলায় অন্তত ১৫ জন পুলিশকর্মী নিহত হয়েছিলেন। সেই হামলায়ও বিস্ফোরক বোঝাই একটি গাড়ি গিয়ে পুলিশ পোস্টে ধাক্কা মেরে বিস্ফোরণ ঘটিয়েছিল। বর্তমান হামলার কৌশলের সঙ্গে সেই ঘটনার মিল রয়েছে বলে নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের একাংশের অভিমত।
একের পর এক জঙ্গি হামলা
গত এক বছরে খাইবার পাখতুনখোয়া প্রদেশে জঙ্গি হামলার ঘটনা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে গিয়েছে। বর্তমানে প্রদেশটি পাকিস্তানের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের দল পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। তবে তেহরিক-ই-তালিবান পাকিস্তানের বিরুদ্ধে কী ধরনের কৌশল নেওয়া উচিত, তা নিয়ে কেন্দ্রের সরকার এবং প্রাদেশিক সরকারের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই মতপার্থক্য রয়েছে। এই রাজনৈতিক বিভাজনও সন্ত্রাস দমনের কার্যকারিতায় প্রভাব ফেলছে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা (TTP Attack)। গবেষণা ও নিরাপত্তা বিষয়ক সংস্থা সেন্টার ফর রিসার্চ অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজের ২০২৫ সালের বার্ষিক নিরাপত্তা প্রতিবেদনে উদ্বেগজনক ছবি উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, খাইবার পাখতুনখোয়ায় হিংসার মাত্রা গত বছর থেকে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে গিয়েছে। ২০২৪ সালে যেখানে হিংসায় মৃত্যুর সংখ্যা ছিল ১ হাজার ৬২০, ২০২৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৩৩১-এ। বিশেষজ্ঞদের মতে, খাইবার পাখতুনখোয়া এবং বালুচিস্তানে জঙ্গি কার্যকলাপ নতুন করে মাথাচাড়া দেওয়ায় পাকিস্তানের নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। এসব এলাকায় হামলার প্রধান লক্ষ্য থাকে সেনাবাহিনী, পুলিশ এবং অন্যান্য সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরা। ফলে জঙ্গি দমনে দেশটির নিরাপত্তা বাহিনী সাম্প্রতিক সময়ে অভিযান আরও জোরদার করেছে। তবে ধারাবাহিক হামলা প্রমাণ করছে, জঙ্গিগোষ্ঠীগুলি এখনও উল্লেখযোগ্য সংগঠনগত সক্ষমতা ধরে রেখেছে (TTP Attack) এবং নিরাপত্তা বাহিনীর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে (Pakistan)।

Leave a Reply