মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: তীব্র বিতর্ক, শাসক-বিরোধী বাকযুদ্ধ এবং হট্টগোলের মধ্যেই রাজ্য বিধানসভার বিশেষ অধিবেশনে পাস হয়ে গেল বহুচর্চিত ‘আন্তঃবিশ্ববিদ্যালয় কর্মী ও শিক্ষক বদলি (সংশোধন) বিল, ২০২৬’ (University Staff Teacher Transfer Bill)। ভোটাভুটিতে বিলের পক্ষে পড়েছে ১৭১টি ভোট। বিপক্ষে ভোট দিয়েছেন ১৫ জন বিধায়ক। এই ১৫ জনের মধ্যে (West Bengal) কালীঘাটের তৃণমূল শিবিরের ১১ জন বিধায়ক ছাড়াও রয়েছেন নওসাদ সিদ্দিকী, মোস্তাফিজুর রহমান এবং বিধানসভার দুই কংগ্রেস বিধায়ক।
বিল নিয়ে দীর্ঘ আলোচনায় বিরোধী দলনেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, “যদি এই বিল রাজ্য সরকার কোনও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে বা প্রতিহিংসামূলকভাবে ব্যবহার না করে, তবে আমরা একে নীতিগতভাবে সমর্থন জানাব। তবে কোনওভাবেই যেন প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহার না হয়। মুখ্যমন্ত্রী অতীতে সিপিএমের ‘অনিলায়ন’ এবং পরবর্তীতে ‘মমতায়নে’র কথা বলেছেন। আমাদের আশঙ্কা, বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বশাসন খর্ব করে এই বিলের আড়ালে এখন নতুন করে ‘গৈরিকীকরণ’ চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলছে।” এর পরেই ক্ষোভে বিধানসভা থেকে ওয়াকআউট করেন ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন বিরোধী বিধায়করা।
শুভেন্দুর সাফ কথা (University Staff Teacher Transfer Bill)
বিল নিয়ে আলোচনার সময় মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বিরোধীদের কটাক্ষ করে বলেন, “অতীতে সিপিএম উচ্চশিক্ষায় অনিলায়ন করেছিল। আর আপনাদের পার্টি এখন তিন না চার টুকরো, জানি না, আপনারা করেছিলেন মমতায়ন! আমরা তার কোনওটাই করব না। আমাদের লক্ষ্য দুর্বল বিশ্ববিদ্যালয়গুলিকে আরও শক্তিশালী ও স্বাবলম্বী করে তোলা।”
এদিকে, বিলের মূল উদ্দেশ্য ও প্রস্তাবিত আইনের রূপরেখা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে রাজ্যের উচ্চশিক্ষামন্ত্রী জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায় বলেন, “স্বশাসনের নামে কোনও বিশ্ববিদ্যালয় যদি কুশাসন বা স্বেচ্ছাচারিতা চালায়, তবে এই বিলই হবে রাজ্য সরকারের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার। বর্তমানে একই বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে থাকা কলেজের অধ্যাপকরা এক কলেজ থেকে অন্য কলেজে বদলির সুযোগ পেলেও, বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকদের ক্ষেত্রে তা সম্ভব হত না। এই বৈষম্য দূর করতে এবং রাজ্যের শিক্ষাব্যবস্থায় সমতা আনতেই বিলটি পাস করা হল।”
জুটার ‘ইতিহাস’ সরকারের কাছে রয়েছে: শুভেন্দু
বিল নিয়ে আলোচনায় যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রসঙ্গও উঠে আসে একাধিকবার। মুখ্যমন্ত্রী সরাসরি যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়কে নিশানা করে বলেন, জুটার সদস্যরা অতীতে কোথায়, কখন কী ভূমিকা নিয়েছিলেন, তার সমস্ত ইতিহাস সরকারের কাছে রয়েছে।
বামপন্থী শিক্ষকদের কটাক্ষ করে তিনি বলেন, “এত জ্ঞান, এত আন্তর্জাতিক বুদ্ধি যাঁদের, তাঁদের আমরা রাজ্যের নতুন ও পিছিয়ে পড়া দুর্বল বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে পাঠাব, যাতে সেই সব কেন্দ্রগুলিও সবল হয়ে ওঠে।”
মুখ্যমন্ত্রীর দাবি, প্রস্তাবিত বিলের গুরুত্ব প্রথম দিকে বিরোধী দল এবং অধ্যাপক সংগঠনগুলি বুঝতে পারেনি। এখন সরকারের অবস্থান এবং বিলের সম্ভাব্য প্রয়োগের বিষয়টি আঁচ করেই বিভিন্ন মহলে আপত্তি ও প্রতিবাদ শুরু হয়েছে।
যাদবপুরে ১৩০০ কোটি টাকা অনুদানের ঘোষণা
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক স্লোগান এবং বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরের রাজনৈতিক পরিবেশ নিয়েও বিধানসভায় সরব হন শুভেন্দু। তিনি বলেন, “অনুমতি নিয়ে জাতীয় পতাকা হাতে মিছিল করার অধিকার সবার আছে। কিন্তু ক্যাম্পাসে বসে ‘কিষেনজি’ বা দেশবিরোধী কোনও নাম লেখা কিংবা লাল সেলাম জানানো বরদাস্ত করা হবে না (University Staff Teacher Transfer Bill)।”
তিনি আরও বলেন, “সনাতন ধর্মকে যারা কেবল সাংস্কৃতিক মনে করেন আর ‘কাশ্মীর মাঙ্গে আজাদি’র স্লোগান তোলেন, তাঁদের জবাব নেতাজির ভাষাতেই দেওয়া হবে, গান্ধীর ভাষায় নয়।”
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য ১৩০০ কোটি টাকা অনুদানের ঘোষণা করেন মুখ্যমন্ত্রী। বিধানসভায় তিনি বলেন, “রাজ্য ও কেন্দ্র মিলিয়ে ১৩০০ কোটি টাকা যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে দেওয়া হবে।”
অনুদানের পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি নিয়েও ক্ষোভ উগরে দেন তিনি। মুখ্যমন্ত্রীর দাবি, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিতরে যেন একটি পৃথক রাষ্ট্র গড়ে উঠেছে। সেখানে দেশ ভাঙার চেষ্টা চলছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিতরে ‘কিষেনজি লাল সেলাম’, ‘ফ্রি প্যালেস্তাইন’ কিংবা ‘কাশ্মীর মাঙ্গে আজাদি’র মতো স্লোগান লেখা বরদাস্ত করা হবে না বলে হুঁশিয়ারি দেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর কথায়, “ভারত তেরে টুকড়ে হোঙ্গে লিখলে, আমরাই টুকরো করে দেব। কিষেনজির নাম বিশ্ববিদ্যালয়ে লিখতে দেব না। বেছে বেছে গেরুয়াধারীদের তথাকথিত বামপন্থী অধ্যাপকরা টার্গেট করেছেন, এটা চলবে না।”
সুর চড়ালেন মুখ্যমন্ত্রী
শিক্ষা বিল সংশোধনীর পক্ষে বক্তব্য রাখতে মুখ্যমন্ত্রী উঠতেই বিরোধীরা স্লোগান দিতে শুরু করেন। পাল্টা সুর চড়িয়ে শুভেন্দু বলেন, “এই জন্যই আপনারা হেরেছেন। সামনের ভোটে আপনাদের কী অবস্থা গেরুয়া করবে, তা দেখবেন। আপনাদের বিরোধিতায় আমাদের সুবিধাই হচ্ছে।”
তিনি আরও বলেন, “নতুন তৈরি হওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে তথাকথিত পণ্ডিতদের পাঠাব। প্রতিষ্ঠিত আটটি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রচুর অধ্যাপক ও শিক্ষাকর্মী আছেন, তাঁদের অন্যত্র পাঠানো হবে। অন্যান্য রাজ্যেও কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে বদলির সংস্থান রয়েছে। কোন লাইনে যাচ্ছি, বোঝা যেতেই বিল নিয়ে চিড়বিড় করা শুরু হয়েছে। রাজ্যে বিধানসভায় আইন প্রণয়নের এবং নিজস্ব শিক্ষা আইন আনার সম্পূর্ণ ক্ষমতা রয়েছে। সরকারের আইনের জায়গা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনের উপরে।”
‘স্বায়ত্তশাসন থাকবে, সরকারের দায়বদ্ধতাও দেখা হবে’
বিধানসভায় দাঁড়িয়ে বামেদেরও নিশানা করেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্য, “বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন রক্ষা হবে, পাশাপাশি সরকারের দায়বদ্ধতাও দেখা হবে। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় কি দেশের বাইরে? আইনের ফাঁকের সুযোগ নিয়ে মূলত যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে যা চলেছে, তার উত্তরে শৃঙ্খলা আনার জন্য এই আইন জরুরি। সিপিএম অনিলায়ন করেছিল, তৃণমূলের টুকরোরা মমতায়ন করেছিল, আমরা অবশ্য গৈরিকীকরণ করব না।”
বদলি প্রসঙ্গে শুভেন্দু বলেন, “বদলি চাকরির অন্তর্নিহিত শর্ত। অসুবিধা হলে চাকরি ছেড়ে দিন, ঝোলা নিয়ে হোলটাইমার হয়ে যান।”
নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ে অভিজ্ঞ শিক্ষক পাঠানোর পরিকল্পনা
মুখ্যমন্ত্রী জানান, এই আইন রাজ্যের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার জন্য প্রয়োজনীয় ছিল। একই সঙ্গে তিনি আশ্বাস দেন, বিলের কোনও অপপ্রয়োগ হবে না। বিলের মাধ্যমে রাজ্যের আটটি প্রাচীন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মীদের অপেক্ষাকৃত নবীন বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে পাঠানোর পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি। তাঁর বক্তব্য, এর ফলে নতুন বিশ্ববিদ্যালয়গুলির পড়ুয়ারাও অভিজ্ঞ শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মীদের পরিষেবা পাওয়ার সুযোগ পাবেন (West Bengal)। ব্যঙ্গের সুরে শুভেন্দু বলেন, “তথাকথিত সমাজবাদ যাঁরা প্রতিষ্ঠা করতে চান, তাঁদের বিরাট মেধাকে আমরা নতুন বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে কাজে লাগাতে চাই। এতে আপত্তির কী আছে (University Staff Teacher Transfer Bill)?” বিল নিয়ে বিতর্কের গোটা পর্বে বার বার যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রসঙ্গ টেনে আনেন মুখ্যমন্ত্রী। একই সঙ্গে বামপন্থী শিক্ষকদের রাজনৈতিক মতাদর্শ নিয়েও কটাক্ষ করেন তিনি।

Leave a Reply