মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (SIR) নিয়ে কমিশনের অন্দরে মতবিরোধের জল্পনা খারিজ করল জাতীয় নির্বাচন কমিশন (EC)। দেশজুড়ে এসআইআর কার্যকর করা-সহ এ সংক্রান্ত সমস্ত সিদ্ধান্ত কমিশনের তিন সদস্যের সর্বসম্মতিক্রমে নেওয়া হয়েছে বলে জানানো হয়েছে। শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার এবং দুই নির্বাচন কমিশনার এসএস সান্ধু ও বিবেক জোশীর বৈঠকের পর এই বিবৃতি প্রকাশ করা হয় (SIR)। সম্প্রতি বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে এসআইআর নিয়ে নির্বাচন কমিশনের অন্দরে মতপার্থক্যের খবর প্রকাশিত হয়। সেই বিতর্কের মধ্যেই কমিশন স্পষ্ট করেছে, ভোটার তালিকা সংশোধন সংক্রান্ত সিদ্ধান্তগুলি সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়েছে। এসআইআর চলাকালীন ভোটারদের নথিতে অসঙ্গতি ধরা পড়লে তাঁদের শুনানির প্রক্রিয়া সহজ করার কথাও ঘোষণা করেছে কমিশন।
সিদ্ধান্ত সর্বসম্মত, দাবি কমিশনের (EC)
কমিশনের বিবৃতি অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ২৪ জুন বিহার দিয়ে শুরু করে পশ্চিমবঙ্গ এবং দেশের অন্যান্য রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে এসআইআর পরিচালনার নির্দেশ সর্বসম্মতিক্রমে জারি করা হয়েছিল। কমিশনের দাবি, ২০২৬ সালের ২৭ মে সুপ্রিম কোর্টও ওই নির্দেশ বহাল রেখেছে। ২০২৫ সালের ২৭ অক্টোবর ১২টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে এবং ২০২৬ সালের ১৪ মে আরও ১৯টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে এসআইআরের সময়সূচি ঘোষণার সিদ্ধান্তও সর্বসম্মতিক্রমে নেওয়া হয়েছিল বলে জানিয়েছে কমিশন।
একই সঙ্গে কমিশন জানিয়েছে, এসআইআরের জন্য ফর্ম ৬-এর সঙ্গে যুক্ত ঘোষণাপত্রও সুপ্রিম কোর্টের অনুমোদন পেয়েছে। এসআইআর প্রক্রিয়ার বাইরে ভোটার তালিকা সংশোধনের ক্ষেত্রে ১৯৬০ সালের ভোটার নিবন্ধন বিধি অনুযায়ী নির্ধারিত ফর্ম ব্যবহার করা হবে।
কমিশনের তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগকে কেন্দ্র করে অভ্যন্তরীণ মতবিরোধের অভিযোগও অস্বীকার করা হয়েছে। কমিশনের বক্তব্য, ক্যাবিনেট সচিবকে পাঠানো চিঠিটি কোনও নীতিগত সিদ্ধান্ত বা তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগের নীতি সংক্রান্ত ছিল না। সেটি নির্বাচন কমিশনে ডেপুটেশনে কর্মরত এক আধিকারিকের কাজের সঙ্গে সম্পর্কিত।
কমিশন আরও জানিয়েছে, সংশ্লিষ্ট আধিকারিকের জারি করা দায়িত্ব পুনর্বণ্টনের নির্দেশ দুই নির্বাচন কমিশনারের নির্দেশের পর বাস্তবে কার্যকর হয়নি। তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগের উপর ডেপুটি নির্বাচন কমিশনারের তদারকির দায়িত্বও কখনও প্রত্যাহার করা হয়নি।
গোয়ায় বাদ পড়া ৯৭ ভোটারের মধ্যে ৮১ জনের আবেদন
এসআইআর প্রক্রিয়ায় যোগ্য ভোটারদের নাম চূড়ান্ত তালিকা থেকে বাদ পড়ার অভিযোগ নিয়েও প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে নির্বাচন কমিশন। গোয়ার মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের দেওয়া তথ্যের উল্লেখ করে কমিশন জানিয়েছে, তালিকা থেকে বাদ পড়া ভোটারদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে তাঁদের আবেদনপত্র সংগ্রহ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে সংশ্লিষ্ট বুথ লেভেল অফিসারদের (BLO)।
কমিশনের দাবি, গোয়ায় সংশ্লিষ্ট ৯৭ জন ভোটারের মধ্যে ইতিমধ্যেই ৮১ জন ভোটার তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্তির জন্য ফর্ম ৬ পূরণ করেছেন (EC)।
আপত্তি জমার সময়সীমা বৃদ্ধি
দিল্লি ও মহারাষ্ট্রের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকদের আবেদনের ভিত্তিতে এসআইআর সংক্রান্ত দাবি ও আপত্তি জমা দেওয়ার সময়সীমা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে নির্বাচন কমিশন।
কমিশন জানিয়েছে, সংশ্লিষ্ট রাজ্যগুলির মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকদের অনুরোধ বিবেচনা করেই এই সময়সীমা বাড়ানো হয়েছে।
বাড়িতেই যাবেন বিএলও
এসআইআর চলাকালীন যেসব ভোটারের তথ্যের সঙ্গে পূর্ববর্তী ভোটার তালিকার তথ্যের মিল পাওয়া যাচ্ছে না অথবা নথিতে যৌক্তিক অসঙ্গতি রয়েছে, তাঁদের জন্য প্রক্রিয়া সহজ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কমিশন।
এই ধরনের ভোটারদের নোটিশ পাঠানো হলেও সাধারণত তাঁদের ইলেক্টোরাল রেজিস্ট্রেশন অফিসার (ERO) বা অ্যাসিস্ট্যান্ট ইলেক্টোরাল রেজিস্ট্রেশন অফিসারের (AERO) দফতরে শুনানির জন্য হাজির হতে হবে না।
পরিবর্তে বুথ লেভেল অফিসাররা সংশ্লিষ্ট ভোটারদের বাড়িতে গিয়ে প্রয়োজনীয় নথি সংগ্রহ করবেন এবং সেগুলি ইসিআইনেট পোর্টালে আপলোড করবেন। ওই নথির ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেবেন সংশ্লিষ্ট ইআরও।
কেবল ব্যতিক্রমী পরিস্থিতিতে ইআরও প্রয়োজন মনে করলে শুনানির ব্যবস্থা করা হবে। সেক্ষেত্রেও অনলাইন শুনানিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। প্রয়োজন হলে ভোটার তাঁর পরিবারের কোনও প্রাপ্তবয়স্ক সদস্যকে নিজের হয়ে শুনানিতে অংশগ্রহণের অনুমতি দিতে পারবেন। অনলাইন শুনানির পরিকাঠামো আরও শক্তিশালী করার নির্দেশও দিয়েছে কমিশন।
পাশাপাশি, রাত্রিকালীন আশ্রয়কেন্দ্রে বসবাসকারী মানুষ, শ্রমিক, দরিদ্র ও গৃহহীনদের সুবিধার্থে প্রয়োজনীয় সংখ্যক হেল্প ডেস্ক এবং বিশেষ শিবির আয়োজনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে জেলা নির্বাচনী (EC) আধিকারিকদের।
২০টি অঞ্চলে এসআইআর সম্পূর্ণ
পশ্চিমবঙ্গ ও বিহার-সহ ২০টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে এসআইআর প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ হয়েছে বলে জানিয়েছে নির্বাচন কমিশন। সংশোধন প্রক্রিয়া চলাকালীন বা পরবর্তী সময়ে যাঁদের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েছে, তাঁরা নিয়মিত তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নতুন করে নাম অন্তর্ভুক্তির আবেদন জানাতে পারবেন।
একই সুযোগ পাবেন নতুন এবং প্রথমবারের ভোটাররাও। সংশ্লিষ্ট ইআরও-র কাছে আবেদন জানাতে হবে তাঁদের। বাদ পড়া এবং নতুন ভোটারদের নাম অন্তর্ভুক্তির জন্য অবিলম্বে বিশেষ অভিযান শুরুর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে রাজ্য ও জেলা নির্বাচনী আধিকারিকদের (SIR)।
পর্যালোচনায় বিশেষজ্ঞ কমিটি
নির্বাচন কমিশনের ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ইসিআইনেটের কার্যকারিতা ও আইনি বিধি মেনে পরিচালনার বিষয়টি খতিয়ে দেখতে একটি বিশেষ কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। কমিটির নেতৃত্বে থাকবেন একজন সিনিয়র ডেপুটি নির্বাচন কমিশনার। পাশাপাশি আইআইটি বা আইআইআইটি থেকে একজন স্বাধীন বিশেষজ্ঞকেও কমিটিতে রাখা হবে।
কমিশন জানিয়েছে, সংশ্লিষ্ট আইন ও বিধি অনুযায়ী নির্বাচনী আধিকারিকরা যাতে নিজেদের দায়িত্ব পালনের জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য ব্যবহার করতে পারেন, তা নিশ্চিত করা হবে। ইতিমধ্যেই বিভিন্ন রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকদের পরামর্শের ভিত্তিতে পোর্টালে একাধিক পরিবর্তন আনা হয়েছে। প্রয়োজনে আরও পরিবর্তন করা হবে।
ভবিষ্যতে তথ্যপ্রযুক্তি সংক্রান্ত কোনও নতুন মডিউল বা পোর্টাল চালু করার আগে আধিকারিকদের কমিটিতে আলোচনা হবে। তার পর চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য বিষয়টি নির্বাচন কমিশনের কাছে পাঠানো হবে (EC)।
কমিশনের বৈঠক ও প্রশাসনিক কাজেও নতুন নির্দেশ
নির্বাচন কমিশনের প্রতিটি বৈঠকের আলোচ্যসূচি আগাম সদস্যদের কাছে পাঠানো হবে। বৈঠকের কার্যবিবরণীও সংশ্লিষ্ট সকলের মধ্যে বিলি করা হবে বলে জানানো হয়েছে।
পাশাপাশি, কমিশনের সমস্ত আধিকারিকের বার্ষিক কর্মমূল্যায়ন রিপোর্ট প্রতি বছর ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে সম্পূর্ণ করতে হবে। বিদেশ সফরের ক্ষেত্রে কমিশনের অনুমোদন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। নির্বাচন কমিশনারদের দেওয়া সমস্ত নির্দেশ যথাযথভাবে পালন করতে হবে আধিকারিকদের।
এর আগে অভ্যন্তরীণ মতবিরোধের খবর প্রকাশ্যে আসার পর কমিশন জানিয়েছিল, এটি একটি বহুসদস্যবিশিষ্ট সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান (SIR)। লিখিত পর্যবেক্ষণ, প্রযুক্তিগত পরামর্শ এবং অভ্যন্তরীণ যাচাই-বাছাই কমিশনের স্বাভাবিক প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার অংশ। তবে শনিবারের বৈঠকের পর এসআইআর সংক্রান্ত সিদ্ধান্তগুলি সর্বসম্মতভাবে নেওয়ার কথা পুনরায় জানাল কমিশন (EC)।

Leave a Reply