মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: মানিকতলার কেশব ভবন থেকে নিউ টাউনের নবনির্মিত কেশব স্মৃতি ভবনে আরএসএসের কার্যালয় স্থানান্তরকে বাংলায় হিন্দু সমাজ ও চেতনার জাগরণের প্রতিফলন বলে মন্তব্য করলেন সংঘের সরকার্যবাহ দত্তাত্রেয় হোসেবল (Hosabale)। শনিবার নতুন কার্যালয়ের (Keshav Smriti Bhavan) উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, এই ভবন নির্মাণকে কেবল একটি সাংগঠনিক কার্যালয় তৈরির উদ্যোগ হিসেবে দেখা উচিত নয়। এর সঙ্গে হিন্দু সমাজের বৃহত্তর জাগরণের বিষয়টিও জড়িয়ে রয়েছে। নতুন কার্যালয়ের ভূমিকা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে হোসেবল বলেন, “কার্যালয় বসবাসের জায়গা নয়। সংঘের প্রচারকরা কার্যকর্তাদের বাড়িতে থাকবেন।” তাঁর বক্তব্য, কোনও ভবন নিজে থেকে অনুপ্রেরণার কেন্দ্র হয়ে ওঠে না। সেখানে যাঁরা কাজ করেন, তাঁদের জীবনযাপন, আচরণ, নিষ্ঠা ও আদর্শই সেই ভবনকে অনুপ্রেরণার কেন্দ্রে পরিণত করে। সংঘের স্বনির্ভরতার ঐতিহ্য তুলে ধরতে তামিলনাড়ুর একটি ঘটনার উল্লেখ করেন হোসেবল। তিনি জানান, বোমা হামলায় তামিলনাড়ুতে সংঘের একটি কার্যালয় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর রাজ্য সরকার সেটি পুনর্নির্মাণের প্রস্তাব দিয়েছিল। কিন্তু স্বয়ংসেবকরা সেই প্রস্তাব গ্রহণ করেননি। নিজেদের উদ্যোগেই তাঁরা আগের চেয়ে বড় একটি ভবন নির্মাণ করেন। তাঁর মতে, এই ঘটনা সংঘের স্বনির্ভরতার ঐতিহ্য এবং নিজেদের প্রচেষ্টায় সাংগঠনিক প্রয়োজন পূরণের সক্ষমতার পরিচয় দেয়।
কেশব রাও দীক্ষিতের স্মৃতিতে নতুন ভবন (Keshav Smriti Bhavan)
মানিকতলার পুরনো কেশব ভবনটি নির্মিত হয়েছিল আরএসএসের প্রতিষ্ঠাতা ডাঃ কেশব বলিরাম হেডগেওয়ারের স্মৃতিতে। নিউ টাউনের নতুন ভবনটির নামকরণ করা হয়েছে প্রবীণ সংঘ প্রচারক কেশব রাও দীক্ষিতের স্মরণে। সাংগঠনিক কাজের জন্য তিনি পশ্চিমবঙ্গে এসেছিলেন এবং এই রাজ্যেই তাঁর জীবনাবসান হয়।
অনুষ্ঠানে কেশব রাও দীক্ষিত এবং পশ্চিমবঙ্গে দীর্ঘদিন কাজ করা প্রয়াত সংঘ প্রচারক শ্যামলাল বন্দ্যোপাধ্যায়ের অবদান স্মরণ করেন হোসবালে। তিনি বলেন, তাঁদের জীবন এবং কাজ আজও সংঘের স্বয়ংসেবকদের অনুপ্রাণিত করে। কোনও পদ বা দায়িত্বের কারণে নয়, বরং সংগঠন ও সমাজের প্রতি আজীবন নিষ্ঠা এবং ব্যক্তিগত আচরণের মাধ্যমেই তাঁরা মানুষের মনে প্রভাব বিস্তার করেছিলেন।
সংঘের সাংগঠনিক সম্প্রসারণের কথাও তুলে ধরেন সরকার্যবাহ। তাঁর বক্তব্য, দেশজুড়ে সংঘের শাখা, স্বয়ংসেবক, প্রশিক্ষণ কর্মসূচি এবং সামাজিক উদ্যোগের সংখ্যা বেড়েছে। সাংগঠনিক কাজের পরিধি বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে উপযুক্ত পরিকাঠামোর প্রয়োজনও তৈরি হয়েছে। তবে কার্যালয় নির্মাণের মূল উদ্দেশ্য সাংগঠনিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ডকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া।
প্রত্যাশা নয়, লক্ষ্য সমাজসেবা
হোসেবল বলেন, সংঘের কোনও প্রচারক পদ, স্বীকৃতি কিংবা ব্যক্তিগত সুবিধা পাওয়ার প্রত্যাশা নিয়ে সাংগঠনিক কাজে যোগ দেন না। তাঁর কথায়, “একজন স্বয়ংসেবক বা প্রচারক কখনও ভাবেন না, তিনি কোন দায়িত্ব বা পদ পাবেন। তিনি এই ভাবনা নিয়েই কাজ করেন যে, তিনি কয়েক দিন থাকুন বা না থাকুন, দেশের উন্নতি হওয়া উচিত।”
দেশের বিভিন্ন প্রান্তে প্রচারকদের পাঠানোর ঐতিহ্যের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, প্রচারকরা নিজেদের কর্মস্থলকেই কর্মভূমি হিসেবে গ্রহণ করেন। এক রাজ্য থেকে অন্য রাজ্যে গিয়ে ব্যক্তিগত লাভের প্রত্যাশা ছাড়াই তাঁরা সমাজের জন্য জীবন উৎসর্গ করেন।
সংঘের কার্যালয়গুলি সম্পর্কে হোসবালে বলেন, সেগুলিকে কেবল প্রচারকদের আবাসস্থল হিসেবে দেখা উচিত নয়। তাঁর কথায়, “কার্যালয় শুধু প্রচারকদের বসবাসের জন্য নয়। এটি (Keshav Smriti Bhavan) কাজের জায়গা।”
তিনি জানান, সেখানে কর্মরত স্বয়ংসেবকদের আচরণ, শৃঙ্খলা ও সাধনার মাধ্যমেই একটি কার্যালয় অনুপ্রেরণার কেন্দ্র হয়ে ওঠে। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সংঘের কার্যালয়গুলির ইতিহাস সংগঠনের কর্মকাণ্ড এবং স্বয়ংসেবকদের জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
ভবিষ্যতের প্রয়োজনের কথা মাথায় রেখে আধুনিক সুযোগ-সুবিধা ও পরিকাঠামো গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তার কথাও স্বীকার করেন তিনি। তবে তাঁর বক্তব্য, “কোনও কার্যালয় বা ভবন নিজে থেকে অনুপ্রেরণা দেয় না। সেখানে যাঁরা থাকেন, কাজ করেন এবং আসেন, সেই স্বয়ংসেবক ও কার্যকর্তারাই ভবনটিকে শক্তি ও প্রাণশক্তি জোগান।”
সংঘের কাজের ভিত্তি স্বেচ্ছাসেবা
আরএসএসের কর্মকাণ্ডের ভিত্তি স্বেচ্ছাসেবা ও নিষ্ঠা বলে মন্তব্য করেন হোসবালে। তিনি জানান, সংগঠনের স্বয়ংসেবকরা কোনও পারিশ্রমিকের প্রত্যাশা ছাড়াই দেশ ও সমাজের জন্য নিজেদের নিয়োজিত করেন।
“তন সমর্পিত, মন সমর্পিত অউর ইয়ে জীবন সমর্পিত”—অর্থাৎ মাতৃভূমির জন্য শরীর, মন ও জীবন উৎসর্গ করার আদর্শই সংঘের মাধ্যমে স্বয়ংসেবকরা গ্রহণ করেন বলে জানান তিনি।
হোসেবলের বক্তব্য, স্বয়ংসেবকদের অবদান কেবল কার্যালয় নির্মাণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তাঁদের নিষ্ঠার মাধ্যমেই সমাজসেবা, সামাজিক সংগঠন গড়ে তোলা এবং রাষ্ট্রগঠনের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড এগিয়ে চলে।
গত এক শতাব্দীতে সংঘের দীর্ঘ পথচলার প্রসঙ্গ তুলে তিনি স্বীকার করেন, এখনও বহু সমস্যা ও প্রতিকূলতা রয়েছে। তাঁর কথায়, “সব প্রশ্নের সমাধান হয়নি এবং সব সমস্যাও দূর হয়ে যায়নি। এখনও নানা চ্যালেঞ্জ ও সংকট রয়েছে (Keshav Smriti Bhavan)।”
তবে আত্মবিশ্বাস ও দৃঢ় সংকল্প নিয়ে সমস্যার মোকাবিলা করলে সমাধানের পথে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব বলে মন্তব্য করেন তিনি। হোসেবলের কথায়, “সংকল্প যত বড় হয়, সমস্যা তত ছোট হয়ে যায় (Hosabale)।”
বক্তব্যের শেষে তিনি বলেন, কেশব স্মৃতি ভবনকে এমন একটি কেন্দ্র হয়ে উঠতে হবে, যা স্বয়ংসেবক ও সমাজকে নিরন্তর অনুপ্রাণিত করবে। ডাঃ হেডগেওয়ার এবং কয়েক প্রজন্মের নিবেদিতপ্রাণ স্বয়ংসেবকদের আদর্শ অনুসরণ করে দেশ ও সমাজের জন্য কাজ করার আহ্বান জানান তিনি। পাশাপাশি আগামী শতাব্দীর প্রয়োজনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা এবং সংঘের কাজের মৌলিক বৈশিষ্ট্য অক্ষুণ্ণ রাখার উপর গুরুত্ব দেন।
রাম-শরদ কোঠারি প্রতিভা সম্মান অনুষ্ঠানে হোসেবল
এদিন কলকাতার আলিপুরে জাতীয় গ্রন্থাগারের প্রেক্ষাগৃহে রাম-শরদ কোঠারি স্মৃতি সংঘ আয়োজিত ‘রাম-শরদ কোঠারি প্রতিভা সম্মান ২০২৬’ অনুষ্ঠানেও যোগ দেন দত্তাত্রেয় হোসেবলে। অনুষ্ঠানে প্রধান বক্তা হিসেবে উপস্থিত ছিলেন তিনি। প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী।
কলকাতার বাসিন্দা দুই ভাই রামকুমার ও শরদকুমার কোঠারি ১৯৯০ সালে অযোধ্যায় রামমন্দির আন্দোলনের সময় নিহত হন। তাঁদের স্মরণে প্রতিবছর এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। সমাজের উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখা ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে এই অনুষ্ঠানে সম্মানিত করা হয়।
এবারের অনুষ্ঠানে পুরুলিয়ার বিদ্যাসাগর শিশু শিক্ষা নিকেতনের (Hosabale) প্রধান শিক্ষক ঈশ্বরচন্দ্র হেমব্রম, ওড়িশার পরিবেশকর্মী রমেশচন্দ্র মিশ্র এবং ঝাড়খণ্ডের ধ্যান ফাউন্ডেশনকে সমাজে অবদানের জন্য সম্মানিত করা হয় (Keshav Smriti Bhavan)।

Leave a Reply