মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণে আনতে রাশিয়ার সঙ্গে তেল সরবরাহ চুক্তির কথা ঘোষণা করলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে আলোচনার পর ট্রাম্পের দাবি, রাশিয়া অবিলম্বে ৩ লক্ষ টনেরও বেশি ডিজেল সরবরাহ করবে। একই সঙ্গে মস্কোর উপর জারি থাকা জ্বালানি-সংক্রান্ত নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার পদক্ষেপ নিয়েছে ওয়াশিংটন। তবে এই সিদ্ধান্ত ঘিরে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। জেলেনস্কির কথায়, এই পদক্ষেপ ‘সৎ নয়, অংশীদারদের প্রতি অযোগ্য এবং দুর্বল সিদ্ধান্ত’। রাশিয়ার বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে নিষেধাজ্ঞা বজায় রাখার পর মার্কিন প্রশাসনের এই অবস্থান পরিবর্তন আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে নতুন বিতর্ক তৈরি করেছে।
ডিজেল সরবরাহে বড় ঘোষণা ট্রাম্পের
সামাজিক মাধ্যমে ট্রাম্প জানিয়েছেন, রাশিয়া অবিলম্বে ৩ লক্ষ টনেরও বেশি ডিজেল জ্বালানি আমেরিকা-সহ আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ করবে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, নভেম্বর মাসে আরও ৫ লক্ষ টন এবং পরবর্তী পর্যায়ে ১০ লক্ষ টন ডিজেল সরবরাহের পরিকল্পনা রয়েছে। ভবিষ্যতে সরবরাহের পরিমাণ আরও বাড়ানো হতে পারে বলেও দাবি করেছেন তিনি। ক্রেমলিনের তরফেও জানানো হয়েছে, আমেরিকা-সহ আন্তর্জাতিক বাজারে তেল ও পেট্রোলিয়ামজাত পণ্য সরবরাহের জন্য রাশিয়া প্রস্তুত রয়েছে। এদিকে, শুক্রবার মার্কিন অর্থ দফতর একটি অস্থায়ী লাইসেন্স জারি করেছে, যার মাধ্যমে ২০২৭ সালের এপ্রিল পর্যন্ত রুশ ডিজেল আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহের সুযোগ তৈরি হবে। ট্রাম্পের বক্তব্য, মার্কিন নাগরিকদের পাশাপাশি কৃষক, পশুপালক ও পণ্য পরিবহণের সঙ্গে যুক্ত ট্রাকচালকদের জন্য জ্বালানির দাম কমানো তাঁর অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার।
হরমুজ প্রণালিতে সঙ্কট, ঊর্ধ্বমুখী জ্বালানির দাম
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির দাম বৃদ্ধির অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে উঠে এসেছে ইরানকে ঘিরে সামরিক সংঘাত এবং হরমুজ প্রণালিতে নৌ-পরিবহণে বিঘ্ন। ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে ইরানকে লক্ষ্য করে আমেরিকা ও ইজরায়েলের হামলার পর তেহরানের তরফে গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথ অবরুদ্ধ করার ঘটনা বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহে বড় প্রভাব ফেলেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ফেব্রুয়ারির শেষ দিক থেকে আমেরিকায় সাধারণ পেট্রোলের গড় দাম ৪৬ শতাংশেরও বেশি বেড়ে প্রতি গ্যালনে ৪.৩৭ ডলারে পৌঁছেছে। ডিজেলের দাম বেড়েছে প্রায় ৬৭ শতাংশ, প্রতি গ্যালন ৬.২৮ ডলারে। রুশ তেল শোধনাগারে ইউক্রেনের হামলাকেও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির জন্য দায়ী করেছেন ট্রাম্প। যদিও আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্নের ক্ষেত্রে ইরানকে ঘিরে সংঘাত এবং হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছে। আসন্ন মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণে আনা ট্রাম্প প্রশাসনের কাছে রাজনৈতিকভাবেও গুরুত্বপূর্ণ। এই নির্বাচনে কংগ্রেসে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখতে রিপাবলিকান পার্টিকে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হতে পারে বলে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা চলছে।
যুদ্ধের অবসান নিয়ে আলোচনা, অমীমাংসিত ভূখণ্ডের প্রশ্ন
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের অবসানের লক্ষ্যে শুক্রবার মায়ামিতে বৈঠকে বসেন মার্কিন ও ইউক্রেনীয় আলোচকেরা। মার্কিন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ জানান, শীতের আগে সংঘাত প্রশমিত করা এবং যুদ্ধের অবসানের সম্ভাব্য পথ নিয়ে গঠনমূলক আলোচনা হয়েছে। এর আগে গত মাসে উইটকফ এবং ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার মস্কো ও কিয়েভ সফর করেছিলেন। তবে দীর্ঘদিনের আলোচনাতেও যুদ্ধের অবসানের প্রশ্নে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি। যুদ্ধবিরতির পথে অন্যতম বড় বাধা ইউক্রেনের ভূখণ্ড নিয়ে বিরোধ। রাশিয়া ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলীয় ডনবাসের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ দাবি করে আসছে। অন্যদিকে, জেলেনস্কি ইউক্রেনের নিয়ন্ত্রণে থাকা ভূখণ্ড রাশিয়ার হাতে তুলে দিতে নারাজ। তাঁর আশঙ্কা, ওই অঞ্চলগুলির উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারলে ভবিষ্যতে নতুন করে সামরিক অভিযান চালানোর সুযোগ পাবে মস্কো। বর্তমানে ইউক্রেনের মোট ভূখণ্ডের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ রাশিয়ার দখলে রয়েছে।
নিরাপত্তার নিশ্চয়তা ও পুনর্গঠন নিয়েও আলোচনা
উইটকফের বক্তব্য অনুযায়ী, মায়ামির বৈঠকে ইউক্রেনের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা, ভবিষ্যতে সংঘাত এড়াতে ইউক্রেন ও ইউরোপের দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং যুদ্ধ-পরবর্তী ইউক্রেনের পুনর্গঠন নিয়েও আলোচনা হয়েছে। বৈঠকে ব্রিটেন, ফ্রান্স ও জার্মানির প্রতিনিধিদের পাশাপাশি ন্যাটো এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিনিধিরাও উপস্থিত ছিলেন। এরই মধ্যে ইউক্রেনে রুশ হামলায় প্রাণহানির ঘটনা যুদ্ধের অবসানের দাবিকে আরও জোরালো করেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার সামনের সারির শহর ক্রামাতোরস্কে বাসে রুশ হামলায় ৩০ জনের মৃত্যু হয়েছে। একদিকে জ্বালানির দাম নিয়ন্ত্রণে রাশিয়ার সঙ্গে অর্থনৈতিক সমঝোতার পথে হাঁটছে ওয়াশিংটন, অন্যদিকে ইউক্রেন যুদ্ধের অবসানে কূটনৈতিক উদ্যোগ চালিয়ে যাচ্ছে মার্কিন প্রশাসন। এই দুই পদক্ষেপের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা ট্রাম্পের বিদেশনীতির সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।

Leave a Reply