মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: পাক-অধিকৃত জম্মু ও কাশ্মীরে সাম্প্রতিক নির্বাচনকে প্রত্যাখ্যান করেছে জেলবন্দি প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের দল পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই)। ২৯ জুলাই দলটি পুরো নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে “প্রহসন” বলে অভিহিত করেছে। একই সঙ্গে ওই অঞ্চলে সাম্প্রতিক হিংসার নিন্দা করে পিটিআই বলেছে, গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের কারণে আন্তর্জাতিক মহলে পাকিস্তান সম্পর্কে ভুল বার্তা যাচ্ছে। পিটিআই চেয়ারম্যান গওহর আলি খানের সঙ্গে যৌথ সাংবাদিক সম্মেলনে পাক-অধিকৃত জম্মু ও কাশ্মীরের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী সর্দার কাইয়ুম নিয়াজি বলেন, কাশ্মীরিদের নজিরবিহীন নিপীড়ন ও বর্বরতার মুখে পড়তে হচ্ছে। সংবাদমাধ্যম দ্য এক্সপ্রেস ট্রিবিউনের প্রতিবেদনের উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি বলেন, “কাশ্মীরিদের এমনভাবে পিষে ফেলা হচ্ছে, যার কোনও নজির নেই।” তিনি বলেন, জম্মু ও কাশ্মীর যৌথ আওয়ামি অ্যাকশন কমিটির বিক্ষোভকারীরা সমঝোতায় পৌঁছানোর জন্য সব ধরনের চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু নিজেদের দাবিদাওয়া আর শোনা হচ্ছে না বুঝতে পেরে তাঁরা ৯ জুন বিক্ষোভের কথা ঘোষণা করেন। নিয়াজির কথায়, “তাঁরা শান্তিপ্রিয় মানুষ এবং আজও শান্তিপূর্ণ রয়েছেন। বলুন তো, সেখানে আমাদের বাহিনীর কোনও সদস্য গুলিতে নিহত হয়েছেন, কিংবা লাঠির ঘায়ে আহত হয়েছেন? এই মানুষগুলি গুলি খাচ্ছেন, তবুও শান্তিপূর্ণভাবে দাঁড়িয়ে রয়েছেন।”
তিন দফায় নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন (POJK Polls)
পাক-অধিকৃত জম্মু ও কাশ্মীরে তিন দফায় নির্বাচন আয়োজনের সিদ্ধান্ত নিয়েও প্রশ্ন তোলেন নিয়াজি। তাঁর দাবি, ওই অঞ্চলের জনসংখ্যা মেরেকেটে ৩৫ থেকে ৪০ লাখ। অথচ ২৫ কোটি মানুষের পাকিস্তানে এক দফায়ই নির্বাচন হয়। তিনি প্রশ্ন করেন, “পাকিস্তানের জনসংখ্যা ২৫ কোটি এবং সেখানে এক দফায় নির্বাচন হয়। এখানে তিন দফার কী প্রয়োজন? কাশ্মীরে কী ধরনের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে?” তিনি ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে পাকিস্তানের জাতীয় নির্বাচনের প্রসঙ্গও তোলেন। ওই নির্বাচনে একই সঙ্গে প্রাদেশিক পরিষদ ও জাতীয় পরিষদের ভোট হয়েছিল। নিয়াজির অভিযোগ, সেই নির্বাচনে পাকিস্তান মুসলিম লিগ-নওয়াজের পক্ষে ব্যাপক কারচুপি করা হয়েছিল। দলটির প্রধান নওয়াজ শরিফকে লন্ডন থেকে পাকিস্তানে ফিরে এসে নির্বাচনী প্রচারে নেতৃত্ব দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল বলেও দাবি করেন তিনি।
গওহরের বক্তব্য
গওহরও সাম্প্রতিক নির্বাচনী প্রক্রিয়ার তীব্র সমালোচনা করেন। তাঁর অভিযোগ, ২৭ জুলাইয়ের নির্বাচন ওই অঞ্চলের মানুষের সঙ্গে “প্রহসন” করা হয়েছে। তিনি বলেন, “২৭ তারিখে যে নির্বাচন হয়েছে, তা আপনারা সবাই দেখেছেন। নির্বাচনের নামে এটি ছিল একটি প্রহসন। এখন সবাইকে মেনে নিতে হবে যে গুলি ও লাঠি ব্যবহার করে, মানুষকে দমন করে, তাদের কণ্ঠরোধ করে এবং প্রতিবাদ করতে বাধা দিয়ে সমস্যার সমাধান করা যায় না। মানুষের কথা শোনাই গণতন্ত্র।” পাক-অধিকৃত জম্মু ও কাশ্মীরের পরিস্থিতির নিন্দা করে গওহর পাকিস্তান পিপলস পার্টি এবং পাকিস্তান মুসলিম লিগ-নওয়াজের বিরুদ্ধেও রাজনৈতিক স্বার্থে পরিস্থিতিকে ব্যবহার করার অভিযোগ তোলেন। তিনি বলেন, “আমরা প্রকাশ্যেই বলছি, সেখানে মৃতদেহ পড়ে ছিল, মানুষ রক্তে ভেসে যাচ্ছিল, আর রাজনৈতিক দলগুলি তা নিয়ে রাজনীতি করেছে। একজন আর একজনকে অভিনন্দন জানিয়েছে, অন্যজন অভিযোগ করেছে যে তার বিরুদ্ধে নির্বাচন কারচুপি করা হয়েছে।” গওহরের দাবি, এই দুই দলই গত ৪০ বছর ধরে চলা রাজনৈতিক ব্যবস্থার অধীনে ক্ষমতায় থেকেছে এবং নিজেদের প্রদেশগুলিতে পরাজিত হয়েছে। তাঁর মতে, নির্বাচনে কম ভোটার উপস্থিতিই এই দুই দলের প্রতি মানুষের প্রত্যাখ্যানের প্রতিফলন। তিনি বলেন, “এত কম ভোটার উপস্থিতি পুরো ব্যবস্থা এবং এই দুই দলের ওপর অনাস্থার প্রতিফলন। এটি তাদের বিরুদ্ধে গণভোটের সমান।” গওহর আরও বলেন, বর্তমান রাজনীতি মূলত ব্যক্তিগত স্বার্থ দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে।
পিপিপি ও পিএমএল-এনের সংঘাত
এদিকে মিরপুর বিভাগের নির্বাচনী ফল নিয়ে পাকিস্তান পিপলস পার্টি এবং পাকিস্তান মুসলিম লিগ-নওয়াজের মধ্যে অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগ শুরু হয়েছে। পিপিপি চেয়ারম্যান বিলাওয়াল ভুট্টো জারদারির অভিযোগ, সর্বত্র কারচুপি করে, ভয় দেখানো এবং রাজনৈতিক ঘুষকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে পিএমএল-এন জনগণের রায় চুরি করেছে। পিএমএল-এনের নির্বাচনী বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন বিলাওয়াল। পাক-অধিকৃত জম্মু ও কাশ্মীরের প্রথম দফার ভোটে ব্যাপক কারচুপির অভিযোগ তুলে পুনর্নির্বাচনের দাবি জানান তিনি। ২৯ জুলাই মুজাফফরাবাদে পিপিপির এক কর্মী সমাবেশে বক্তব্য রাখতে গিয়ে বিলাওয়াল নির্বাচন কমিশনের উদ্দেশে বলেছিলেন, “আপনারা যদি এই কারচুপির সঙ্গে জড়িত না থাকেন, তাহলে মিরপুরে পুনর্নির্বাচনের আয়োজন করুন।” নির্বাচন কমিশনের কথিত নিরপেক্ষতার বিরুদ্ধে এটিই এখন পর্যন্ত তাঁর সবচেয়ে সরাসরি ও কঠোর চ্যালেঞ্জ বলে মনে করা হচ্ছে।
‘শাহবাজ-মরিয়ম জনগণের ভোটে ক্ষমতায় আসেননি’
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ এবং পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী মরিয়ম নওয়াজ শরিফকে সরাসরি কটাক্ষ করেন বিলাওয়াল। তিনি বলেন, “আজ কেউ যদি প্রধানমন্ত্রীর আসনে বসে থাকেন, কিংবা কেউ মুখ্যমন্ত্রীর পদে বসে থাকেন, তা জনগণের ভোটে বা আপনাদের কর্মদক্ষতার কারণে নয়—এটি একটি ফর্ম-৪৭-এর ফল, এটা একটি শিশুও জানে।” ফর্ম-৪৭ হল কোনও নির্বাচনী এলাকার সব ভোটকেন্দ্রে গণনা করা ভোটের ফলের প্রাথমিক সমন্বিত বিবরণী, যা সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং আধিকারিক প্রস্তুত করেন। ২০২৪ সালের সাধারণ নির্বাচনের পর থেকে পিটিআই-সহ বিরোধীরা এই শব্দটি ব্যবহার করে নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ তুলে আসছে। বিলাওয়ালের অভিযোগ, পাঞ্জাব ও জাতীয় পরিষদের একাধিক আসনে পিএমএল-এন পরাজিত হলেও, রিটার্নিং আধিকারিকরা মিথ্যাভাবে দলটিকে বিজয়ী ঘোষণা করেন। তাঁর দাবি, নিরাপত্তা বাহিনীর সহায়তায় এই কারচুপির ফলেই শাহবাজ শরিফ প্রধানমন্ত্রী এবং মরিয়ম নওয়াজ পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী হয়েছেন। ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের আগে বিলাওয়াল দাবি করেছিলেন, দেশজুড়ে ব্যাপক জনসমর্থনের কারণে তাঁর দল কেন্দ্রীয় সরকার গঠন করবে। তবে পরে ইমরানের পিটিআইও অভিযোগ করে, তাদের নির্বাচনী প্রতীক ক্রিকেট ব্যাটে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে না দেওয়া-সহ বিভিন্ন উপায়ে প্রাদেশিক পরিষদ ও জাতীয় পরিষদে তাদের জনগণের রায় থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে।
‘এটা আপনার কথা নয়, ফর্ম-৪৭ কথা বলছে’
বিলাওয়ালের বক্তব্যের আগেই মরিয়ম নওয়াজ সোশ্যাল মিডিয়ায় পিপিপিকে কটাক্ষ করে বলেন, “কারচুপির সূক্ষ্ম শিল্পে ওস্তাদ পিপিপি এখন অন্যায় হয়েছে বলে কান্নাকাটি করছে। প্রলয় কবে আসবে?” এর জবাবে পিপিপির শরজিল মেমন বলেন, “এটা আপনি বলছেন না, ফর্ম-৪৭ কথা বলছে। প্রলয় এসেছিল ২০২৪ সালে, যখন জনগণের রায় দান হিসেবে বিলিয়ে দেওয়া হচ্ছিল।” বিলাওয়ালও পিএমএল-এনকে “কারচুপির ফসল” বলে আখ্যা দেন। নিজের দলের সঙ্গে পিএমএল-এনের তুলনা করে তিনি বলেন, পিপিপির রাজনৈতিক ইতিহাস তিন প্রজন্মের। তাঁর দাবি, “এমন একটি নির্বাচনও নেই, যেখানে পিএমএল-এন জনগণের ভোটে জিতেছে—সবসময় কারচুপির মাধ্যমে জিতেছে।”
‘কাশ্মীরের মানুষের রায় চুরি করতে দেওয়া হবে না’
বিলাওয়াল প্রশ্ন করেন, “তারা কি মনে করে, কাশ্মীরে আমরা তাদের নির্বাচন কারচুপি করতে দেব?” তিনি আরও বলেন, “কাশ্মীরের মানুষ মাথা নত করবে না এবং কাউকে তাদের রায় চুরি করতে দেবে না।” মুজাফফরাবাদের উদ্দেশে ইঙ্গিত করে বিলাওয়াল বলেন, “এটি মুজাফফরাবাদ, শ্রীনগর নয়।” তাঁর দাবি, বিরোধী পক্ষের কারচুপির চেষ্টা ব্যর্থ করতে তাঁর দল সর্বাত্মক চেষ্টা করবে। তিনি আরও দাবি করেন, ৩০টি ভোটকেন্দ্রে ভোটার উপস্থিতি ছিল ৯০ শতাংশ, অথচ অধিকাংশ নির্বাচনী এলাকায় ভোটার উপস্থিতি ছিল ৪০ থেকে ৫০ শতাংশের মধ্যে। পিপিপি কর্মীদের উদ্দেশে বিলাওয়ালের প্রতিশ্রুতি, “আমি চুরি যাওয়া প্রতিটি ভোট ফিরিয়ে আনব”। তিনি বলেন, “আমি পরাজয় মেনে নিতে প্রস্তুত। কিন্তু আপনারা যদি নির্বাচন কারচুপি করে আমাদের রায় চুরি করতে চান, তাহলে আমি এই ফল মেনে নিতে পারি না।”
সত্য ও পুনর্মিলন কমিশনের প্রস্তাব
পাক-অধিকৃত জম্মু ও কাশ্মীরের চলমান অস্থিরতা মোকাবিলায় সত্য ও পুনর্মিলন কমিশন গঠনের প্রস্তাবও পুনর্ব্যক্ত করেন বিলাওয়াল। তিনি বলেন, “আমি এই প্রস্তাব রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে বা বিক্ষোভকারীদের পক্ষ থেকে দিচ্ছি না। আমি এটি দিচ্ছি সেই প্রতিটি কাশ্মীরির পক্ষ থেকে, যারা এই দু’পক্ষের কোনওটির সঙ্গে যুক্ত নন।” সরকার এবং বর্তমানে নিষিদ্ধ ঘোষিত যৌথ আওয়ামি অ্যাকশন কমিটি—উভয় পক্ষকেই এই দাবি মেনে নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। বিলাওয়ালের প্রশ্ন, “আপনারা যদি সঠিক পথে থাকেন এবং সত্যের পক্ষে থাকেন, তাহলে কমিশন গঠন করছেন না কেন?”
কাশ্মীরের অর্থনৈতিক সঙ্কট নিয়েও সরব বিলাওয়াল
কাশ্মীরে কর্মসংস্থানের কথা পিপিপি কেন বলছে, তার ব্যাখ্যায় বিলাওয়াল বলেন, তাঁর দল এই অঞ্চলের “অর্থনৈতিক সঙ্কট” সম্পর্কে সচেতন। এরপরেও পিএমএল-এনকে আক্রমণ করে তিনি দাবি করেন, দলটির অর্থনৈতিক দর্শন মূলত “ধনীদের আরও ধনী করা” নীতির ওপর নির্ভরশীল। বিলাওয়াল বলেন, “তারা আমাদের কটাক্ষ করে বলে, আমরা নাকি কাশ্মীরকে সিন্ধে পরিণত করতে চাই। না, আমি চাই কাশ্মীর কাশ্মীরই থাকুক এবং মানুষই তার ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করুক।” তিনি আরও বলেন, “পাঞ্জাব, ইসলামাবাদ, খাইবার পাখতুনখোয়া, সিন্ধ বা বালুচিস্তান কাশ্মীরের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করতে পারে না।” নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন পিপিপি নেতা। নির্বাচন কমিশনের ভূমিকার সঙ্গে পাঞ্জাবের অপরাধ নিয়ন্ত্রণ বিভাগের ভূমিকার তুলনাও করেন তিনি।

Leave a Reply