মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: পশ্চিমবঙ্গের (West Bengal) দুর্গাপুজো শুধু ধর্মীয় উৎসব নয়, বাংলার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনেরও অন্যতম বড় পরিসর। ২০২১ সালে কলকাতার দুর্গাপুজোকে (Durga Puja) মানবতার বিমূর্ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রতিনিধি তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে ইউনেস্কো। তাদের নথিতে দুর্গাপুজোকে ধর্ম, শিল্প, কারুশিল্প ও সমবেত সামাজিক অংশগ্রহণের গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।
তবে গত এক দশকে দুর্গাপুজোকে ঘিরে পশ্চিমবঙ্গে একাধিক হিংসাত্মক ঘটনা, প্রশাসনিক বিধিনিষেধ, পুলিশি পদক্ষেপ এবং রাজনৈতিক বিতর্ক সামনে এসেছে। এর মধ্যে কিছু ঘটনায় পুজোমণ্ডপ বা বিসর্জনকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষের অভিযোগ রয়েছে, আবার কিছু ঘটনায় প্রতিবাদ, মতপ্রকাশের অধিকার এবং প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। ফলে উৎসবের নিরাপত্তা, ধর্মীয় স্বাধীনতা, মতপ্রকাশের অধিকার এবং প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
শারদোৎসব না দুর্গাপুজো? (Durga Puja)
২০২৬ সালের ১০ সেপ্টেম্বর বিধানসভায় দুর্গাপুজোর মণ্ডপের কাছে বামপন্থী সংগঠনগুলির বইয়ের স্টল নিয়ে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী জানান, যে সব বামপন্থী বইয়ের স্টলে “দুর্গাপুজো”র পরিবর্তে “শারদোৎসব” শব্দ ব্যবহার করা হবে, সেই স্টলকে পুজো কমিটিগুলির অনুমতি দেওয়া উচিত নয়। তাঁর অভিযোগ, “শারদোৎসব” শব্দ ব্যবহারের মাধ্যমে উৎসবের ধর্মীয় চরিত্রকে খাটো করা হচ্ছে।
সিপিআই(এম)-এর তরফে এই বক্তব্যের বিরোধিতা করা হয়েছে। দলটির সঙ্গে যুক্ত বইয়ের স্টলগুলির দীর্ঘদিনের ঐতিহ্যের কথাও সামনে এসেছে। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৯৫৪ সালে পার্ক সার্কাসে মুজফ্ফর আহমেদের উদ্যোগে এই ধরনের প্রথম বামপন্থী-সংযুক্ত বইয়ের স্টল বসেছিল। সেখানে রাজনৈতিক ও মতাদর্শগত বইয়ের পাশাপাশি বিভিন্ন বিষয়ে সাহিত্য ও অন্যান্য বই বিক্রি করা হয়েছিল।
সিপিআই(এম)-এর রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিম মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্যের সমালোচনা করে বলেন, “গণতন্ত্র মানে বিভিন্ন সংস্কৃতি ও ভাবনার সহাবস্থান।” দলের পক্ষ থেকে আরও দাবি করা হয়েছে, তাদের বইয়ের স্টলে স্বামী বিবেকানন্দ, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর-সহ বিভিন্ন ভারতীয় ব্যক্তিত্বের উপর বইও থাকে।
ফলে বিতর্কটি কেবল একটি শব্দ ব্যবহারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। দুর্গাপুজোকে প্রধানত ধর্মীয় উৎসব হিসেবে দেখা হবে, নাকি ধর্মীয় তাৎপর্যের পাশাপাশি বৃহত্তর সাংস্কৃতিক উৎসব হিসেবেও তার পরিচয় থাকবে—তা নিয়েও রাজনৈতিক মতপার্থক্য সামনে এসেছে। ২০২৪ সালের দুর্গাপুজোর সময় কলকাতা ও পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন এলাকায় একাধিক ঘটনা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়।
হাওড়ার শ্যামপুরে অশান্তি
অক্টোবর ২০২৪-এ হাওড়ার শ্যামপুরে একটি ছবি নিয়ে দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে উত্তেজনা তৈরি হয়। পরিস্থিতি পরে সংঘর্ষ ও ভাঙচুরে গড়ায়। পুলিশের তরফে ৬৭ জনকে গ্রেফতারের কথা জানানো হয়। এলাকায় ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতার ১৬৩ ধারা জারি এবং মোবাইল ও ইন্টারনেট পরিষেবায় বিধিনিষেধের কথাও প্রকাশ্যে আসে। একই ঘটনায় পুজো কমিটির এক সদস্যের বিরুদ্ধেও মামলা হয়।
গার্ডেনরিচের পুজোমণ্ডপে উত্তেজনা
১১ অক্টোবর কলকাতার গার্ডেনরিচের নিউ বেঙ্গল স্পোর্টিং ক্লাবের পুজোমণ্ডপে একদল যুবকের প্রবেশ ও ধর্মীয় আচার চলাকালীন বাজানো শব্দ নিয়ে আপত্তির অভিযোগ ওঠে। পুজো কমিটির অভিযোগ, ৫০-৬০ জন সেখানে এসে অনুষ্ঠান বন্ধ করার দাবি জানিয়েছিলেন এবং প্রতিমা ভাঙার হুমকিও দেওয়া হয়েছিল। পুলিশ অভিযোগ পাওয়ার পর মামলা করে তদন্ত শুরু করে।
তবে ঘটনাটির প্রেক্ষাপট নিয়ে বিভিন্ন পক্ষের বক্তব্য আলাদা। একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শুক্রবারের নমাজের সময়ে পুজোর শব্দ নিয়ে আপত্তি থেকে বচসার সূত্রপাত এবং পরে স্থানীয় প্রবীণদের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি (Durga Puja) নিয়ন্ত্রণে আসে।
বিসর্জনকে ঘিরে সংঘর্ষ
নরকেলডাঙায় কালীপুজোর বিসর্জনের সময় সংঘর্ষ, পাথর ও কাচের বোতল ছোড়ার ঘটনা নিয়ে ব্যাপক চর্চা হয়। পুলিশ লাঠিচার্জ ও কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। তবে পুলিশ স্পষ্টভাবে জানিয়েছিল, ঘটনাটির সূত্রপাত একটি মোটরবাইক পার্কিং নিয়ে বিবাদের জেরে এবং নির্দিষ্ট কোনও বিসর্জন মিছিলকে লক্ষ্য করে হামলা হয়নি। পুলিশের বক্তব্য, নির্ধারিত বিসর্জনের শোভাযাত্রা পরে নিরাপত্তার মধ্যে সম্পন্ন হয়।
এই ঘটনায় জাতীয় মহিলা কমিশনের সদস্য অর্চনা মজুমদারও রাজ্যপালের কাছে পুলিশি আচরণ নিয়ে অভিযোগ করেছিলেন বলে সংবাদমাধ্যমের খবর।
আরজি কর আন্দোলন এবং পুজোর সময় পুলিশের পদক্ষেপ
২০২৪ সালের পুজোর সময় আরজি কর-কাণ্ডের প্রতিবাদও দুর্গাপুজোর পরিসরে এসে পড়ে। ৯ অক্টোবর জুনিয়র চিকিৎসকদের “অভয়া পরিক্রমা” কর্মসূচিকে কলকাতা পুলিশ আটকে দেয়। এ নিয়ে পুলিশের সঙ্গে চিকিৎসকদের উত্তেজনা তৈরি হয়।
১৫ অক্টোবর সরকারি দুর্গাপুজো কার্নিভালে কর্তব্যরত চিকিৎসক তপোব্রত রায়কে প্রতিবাদী ব্যাজ পরার অভিযোগে গ্রেফতার করা হয়। পরে তাঁকে জামিনে মুক্তি দেওয়া হয়। মামলাটির তদন্তে কলকাতা হাইকোর্ট অন্তর্বর্তী স্থগিতাদেশও দেয়। আদালতের নথিতে বলা হয়েছে, ব্যাজে লেখা বক্তব্যকে আপত্তিকর মনে করে পুলিশের পক্ষ থেকে মামলা করা হয়েছিল।
বস্তুত, আরজি করকাণ্ডের প্রতিবাদ, প্রশাসনের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের সংঘাত এবং উৎসবের সরকারি অনুষ্ঠানে রাজনৈতিক প্রতিবাদের প্রশ্নও এর সঙ্গে যুক্ত ছিল।
১১২ ফুটের দুর্গাপ্রতিমা নিয়ে বিতর্ক
নদিয়ার রানাঘাটে ২০২৪ সালে ১১২ ফুট উচ্চতার দুর্গাপ্রতিমা স্থাপনের পরিকল্পনা শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হয়নি। আয়োজকদের বক্তব্য, প্রশাসনিক অনুমতি না মেলায় পুজো বন্ধ রাখতে হয়। পরে ওই জায়গায় মন্দির নির্মাণের সিদ্ধান্তের কথাও জানানো হয়েছিল। এখানে প্রশাসনের আইনশৃঙ্খলা-সংক্রান্ত উদ্বেগ এবং আয়োজকদের পুজো আয়োজনের অধিকার—দুই দিকই আলোচনায় আসে।
সাংবাদিক গ্রেফতারির ঘটনায় বিতর্ক
২০২৪ সালের নভেম্বরে কলকাতার একটি সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে যুক্ত সাংবাদিক অনন্য গুপ্তকে গ্রেফতার করা হয়। পুলিশ জানিয়েছিল, সংশ্লিষ্ট সংবাদমাধ্যমের সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়ানো একটি প্রতিবেদনে বিভ্রান্তিকর তথ্য ও বিশৃঙ্খলা তৈরির অভিযোগ রয়েছে। রাজনৈতিক মহলের একটি অংশ এবং সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার পক্ষে থাকা ব্যক্তিরা অনন্যর গ্রেফতারির সমালোচনা করেন।
২০১৪-র বর্ধমান বিস্ফোরণ
দুর্গাপুজোর সময় পশ্চিমবঙ্গে নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনায় ২০১৪ সালের বর্ধমানের খাগড়াগড় বিস্ফোরণও গুরুত্বপূর্ণ। তবে প্রচলিত কিছু প্রতিবেদনে তারিখ নিয়ে বিভ্রান্তি রয়েছে। বিস্ফোরণটি ঘটে ২ অক্টোবর ২০১৪ সালে; কিন্তু ১৯ জনকে দোষী সাব্যস্ত করা হয় ২৮ অগাস্ট ২০১৯ সালে। দোষী সাব্যস্তদের মধ্যে চারজন বাংলাদেশের নাগরিক ছিলেন। মামলাটি নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন জামাতুল মুজাহিদিন বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্ত নেটওয়ার্কের তদন্তের সঙ্গেও সম্পর্কিত ছিল।
অতএব, ঘটনাটিকে “২০১৪ সালের ২৮ আগস্টের মামলা” বলা সঠিক নয়; ২৮ আগস্ট ২০১৯ ছিল দোষী সাব্যস্ত হওয়ার তারিখ।
দুর্গাপুজোর সাংস্কৃতিক পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন
ইউনেস্কোর নথিতে কলকাতার দুর্গাপুজোকে শুধু ধর্মীয় আচার হিসেবে নয়, শিল্পী, কারিগর, পুজো কমিটি, পুরোহিত, ঢাকি এবং সাধারণ মানুষের সম্মিলিত সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। নথিতে বলা হয়েছে, উৎসবের সময়ে শ্রেণি, ধর্ম ও জাতিগত বিভাজন অনেকাংশে অতিক্রম করে মানুষ পুজোমণ্ডপ পরিদর্শনে অংশ নেয়।
এই কারণেই পুজোকে ঘিরে হিংসা, প্রতিমা ভাঙচুরের অভিযোগ, প্রশাসনিক বিধিনিষেধ কিংবা মতপ্রকাশের উপর নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ—প্রতিটি ঘটনাই বৃহত্তর সাংস্কৃতিক ও নাগরিক অধিকারের আলোচনার সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়।
তবে ঘটনাগুলির প্রকৃতি এক নয়। কোথাও সাম্প্রদায়িক উত্তেজনার অভিযোগ, কোথাও ব্যক্তিগত বা স্থানীয় বিবাদ, কোথাও রাজনৈতিক আন্দোলন, আবার কোথাও প্রশাসনিক অনুমতি বা আইনশৃঙ্খলার প্রশ্ন রয়েছে। ফলে সব ঘটনাকে একই ধরনের “পরিকল্পিত হামলা” হিসেবে দেখার আগে প্রত্যেকটির প্রেক্ষাপট, পুলিশের বক্তব্য, মামলা ও আদালতের পর্যবেক্ষণ আলাদাভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
সুমুখে যেসব প্রশ্ন
২০২৬ সালের বইয়ের স্টল-বিতর্ক এই পুরনো আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে। একদিকে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর বক্তব্যে দুর্গাপুজোর ধর্মীয় পরিচয়কে স্পষ্টভাবে তুলে ধরার দাবি রয়েছে। অন্যদিকে বামপন্থী দলগুলি দীর্ঘদিনের বই বিক্রির ঐতিহ্য এবং মতাদর্শগত প্রকাশের অধিকারের কথা বলছে।
একই সঙ্গে, দুর্গাপুজোকে (Durga Puja) ইউনেস্কোর স্বীকৃত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হিসেবে সুরক্ষিত রাখার ক্ষেত্রে নিরাপত্তা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা এবং বিভিন্ন সম্প্রদায়ের অংশগ্রহণ—সবক’টিই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
পশ্চিমবঙ্গে দুর্গাপুজো তাই একই সঙ্গে ধর্মীয় আচার, সাংস্কৃতিক উৎসব, সামাজিক সমাবেশ এবং রাজনৈতিক বিতর্কের ক্ষেত্র। ২০২৬-এর পুজোর আগে বইয়ের স্টল ঘিরে নতুন বিতর্ক দেখিয়ে দিল, উৎসবের পরিচয় ও জনপরিসরে তার অর্থ নিয়ে রাজনৈতিক মতপার্থক্য এখনও যথেষ্ট তীব্র। সামনে (West Bengal) প্রশাসন, পুজো কমিটি, রাজনৈতিক দল এবং সাধারণ মানুষ কীভাবে এই মতপার্থক্য সামলান, তার উপরই অনেকাংশে নির্ভর করবে উৎসবের পরিবেশ।

Leave a Reply